অপচয় কমানোই হোটেলের টেকসই মুনাফার মূল চাবিকাঠি
শুধু বিক্রি বাড়ানোর ওপর নির্ভর না করে খাদ্য ও পানীয় ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ ও পরিকল্পিত করার মাধ্যমে হোটেলগুলো তাদের মুনাফা ও টেকসই পরিচালনা নিশ্চিত করতে পারে বলে মনে করেন ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাখাওয়াত হোসেন।
এভিয়েশন এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কার্যকর ব্যয় ব্যবস্থাপনার শুরু হয় অপচয় কমানো, কার্যক্রমের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অতিথিদের জন্য সবসময় একই মানের খাবার নিশ্চিত করার মাধ্যমে। এ লক্ষ্য অর্জনে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দেন—ক্রয় নিয়ন্ত্রণ, মজুদ নিয়ন্ত্রণ, পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, উপযুক্ত রান্না পদ্ধতি এবং অপচয় নিয়ন্ত্রণ।
তার মতে, এসব পদক্ষেপ একসঙ্গে হোটেলের পরিচালনাগত শৃঙ্খলা শক্তিশালী করে এবং একই সঙ্গে অতিথি সন্তুষ্টি ও মুনাফা ধরে রাখতে সহায়তা করে।
শাখাওয়াত হোসেন বলেন, “লক্ষ্য শুধু খরচ কমানো নয়। বরং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যয় করা, অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি কমানো এবং অতিথিদের জন্য মানসম্মত খাবার ও সেবা নিশ্চিত করাই মূল উদ্দেশ্য।”
তিনি জানান, প্রথম ধাপ হলো ক্রয় নিয়ন্ত্রণ। এতে নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারীদের কাছ থেকে প্রতিযোগিতামূলক দামে ভালো মানের উপকরণ সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর পাশাপাশি রান্নাঘরের কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব।
মজুদ নিয়ন্ত্রণকেও তিনি সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। বিশেষ করে বড় হোটেলগুলোতে খাদ্য ও পানীয়ের মজুদে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ থাকে। সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি, নির্ভুল হিসাবরক্ষণ এবং ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ (এফআইএফও) নীতি অনুসরণ করলে খাদ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে এবং পণ্যের মান অক্ষুণ্ন থাকে।
তিনি আরও বলেন, এই কাঠামোয় সঠিক স্থানান্তর ও পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। গুদাম, রান্নাঘর, রেস্তোরাঁ ও অনুষ্ঠানস্থলের মধ্যে উপকরণ দক্ষতার সঙ্গে সরবরাহ করা গেলে অপচয় কমে। একইভাবে নির্ধারিত পরিমাণে খাবার পরিবেশন করলে মানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং অতিরিক্ত খাদ্য ব্যবহার এড়ানো যায়। প্রতিদিন শত শত খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রে সামান্য পরিমাণের পার্থক্যও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
উপযুক্ত রান্না পদ্ধতিও এই মডেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্ধারিত রেসিপি অনুসরণ, উপকরণের দক্ষ ব্যবহার এবং সঠিক রান্না প্রক্রিয়া বজায় রাখার মাধ্যমে শেফরা একই স্বাদ ও উপস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারেন, পাশাপাশি উপকরণের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারও কমানো সম্ভব হয়।
নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে অপচয় নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন শাখাওয়াত হোসেন। তার মতে, আয়োজন শুরু করার আগে অতিথির সম্ভাব্য সংখ্যা, খাবারের সময়ভিত্তিক চাহিদা এবং অতীতের তথ্য বিশ্লেষণ করলে খাদ্য অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়।
তিনি বলেন, খাদ্য অপচয় আতিথেয়তা শিল্পের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে বুফে ব্যবস্থায় যেখানে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার প্রস্তুত করা সাধারণ ঘটনা। অতিথিদের আচরণ ও চাহিদা পর্যবেক্ষণ করে সে অনুযায়ী খাবার প্রস্তুত করলে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপচয়ও কমানো সম্ভব।
স্থানীয় উৎস থেকে খাদ্যপণ্য সংগ্রহ এবং ‘ফার্ম-টু-প্লেট’ পদ্ধতির গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন তিনি। স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত মৌসুমি পণ্য ব্যবহারের ফলে খাবারের সতেজতা বাড়ে, আমদানিনির্ভরতা কমে এবং আতিথেয়তা খাতের টেকসই উন্নয়নেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
ব্যয় ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে ‘মেনু ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন শাখাওয়াত হোসেন। নিয়মিত মেনুর কার্যকারিতা পর্যালোচনার মাধ্যমে কোন খাবারগুলো জনপ্রিয় ও লাভজনক তা চিহ্নিত করা যায়। একই সঙ্গে অতিথিদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ খাবারগুলো উন্নয়ন বা পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস কখনোই অতিথির অভিজ্ঞতার ক্ষতির কারণ হওয়া উচিত নয়।
শাখাওয়াত হোসেন বলেন, “অতিথিরা মূলত খাবারের মান এবং সেবার অভিজ্ঞতাই মনে রাখেন। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত অপচয় কমিয়ে দক্ষতা বাড়ানো, তবে সেবার মান বজায় রেখেই।”
পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধবভাবে ব্যবসা পরিচালনার চাপের মধ্যে সুশৃঙ্খল খাদ্য ব্যবস্থাপনা হোটেলগুলোকে মুনাফা, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং অতিথি সন্তুষ্টির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।